নিউজ ব্যাংক ২৪. নেট : দেশে সবচেয়ে বেশি লেবু উৎপাদন হয় মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায়। শ্রীমঙ্গলে রয়েছে শতাধিক লেবুর আড়ত। প্রতি দিন লাখ লাখ টাকার লেবু পাইকারি বাজারে বিক্রি হয়। রমজানে লেবুর চাহিদা বেশি। এখন চলছে লেবুর মৌসুম। কিন্তু সপ্তাহখানেক ধরে বাজারে লেবুর দাম আকাশ ছুঁয়েছে। পাইকারি বাজারে হালি ৪০-৬০ টাকা থাকলেও খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকা দরে। যা গত বছরে এই রমজানে বিক্রি হয়েছে কমবেশি খুচরা ৭০ টাকা হালিতে।
কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের কাঁচাবাজারের আড়তদাররা বলেন, গত ৯ মাস লেবুর তেমন চাহিদা ছিল না। কৃষকদের খেতের মধ্যেই লেবু পড়ে ছিল। শ্রমিকদের টাকা দেওয়া তাদের জন্য কষ্টকর ছিল। ১-২ মাস লেবুর চাহিদা থাকে তখন দামও একটু থাকে। তাছাড়া রমজান মাস থাকার কারণে লেবুর চাহিদা বেশি থাকায় দাম বেড়েছে। অথচ এ লেবুর হালি কিছুদিন আগেও বিক্রি হয়েছে ১০-১৫ টাকায় হালিতে।
সরেজমিন কমলগঞ্জের ভানুগাছ বাজার, আদমপুর বাজার ও শমসেরনগর বাজার ও শ্রীমঙ্গলের পুরান ও নতুন বাজারে দেখা যায়, প্রতিটি লেবু পিস বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা। তবে ছোট লেবুর দাম কিছুটা কম।
বাজারে লেবু কিনতে আসা ডলি বেগম জানান, ‘আমার পরিবারের সবসময় লেবুর দরকার হয়। তাছাড়া রমজান মাসে ইফতারের সময় লেবুর শরবত খাই। ভানুগাছ বাজারে যে লেবু নিয়েছিলাম দুই দিন আগেও ১৫-২০ টাকা করে হালি। এখন সেই লেবু কিনতে হচ্ছে ১০০ টাকা হালিতে। অবাক লাগে কী করে এমন দাম হঠাৎ করে বাড়ল। লেবু এত দামে নিতে বাধ্য হচ্ছি।’
শ্রীমঙ্গলের মা বাণিজ্যালয়ের আড়তদার রাজিব আহমদ জানান, ‘প্রতিটা পিস লেবু ৮ থেকে ১৫ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করছি। বাজার চড়া। ৯ মাস লেবুর চাহিদা কম থাকে। রমজানে চাহিদা বেড়ে যায়। যার কারণে লেবুর এই দাম। এবার লেবুর ফলন ভালো হলেও সঠিক সময়ে কৃষক লাভ করতে পারেনি। এখন সরবরাহও কম। তাই দাম চড়া। এখানে বিক্রেতাদের কিছু করার নেই। এই চড়া ভাব আরো বেশ কিছুদিন থাকবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার লেবু দাম দিয়ে রাখি। কিছু টাকা হাতে রেখে বিক্রি করে ফেলি। কিন্তু প্রশাসন আমাদের মাঝে মাঝে এসে জরিমানা করে। এতে যে ক্ষতি হয় তাতে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতেও মন চায়।’
ভানুগাছ বাজারের লেবু বিক্রেতা আলীম মিয়া বলেন, ‘আমরা পাইকারি বাজার থেকে হালি ৮০-১২০ টাকায় কিনে আনি। অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে তাই ১০০-১৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়।
শ্রীমঙ্গলের প্রবীণ লেবু চাষি ছামছুল হক বলেন, ‘আমি ২০-২৫ বছর ধরে লেবুর চাষ করি। এ বছর লেবুর চাষ করেছি ১৫ একর জমিতে। খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকার মতো। এই পর্যন্ত বাজারে বিক্রি করেছি ৩-৪ লাখ টাকার। জমিতে আরো কিছু লেবু আছে। যা বিক্রি করলেও আমার মূল টাকা বেরিয়ে আসবে না।
তিনি আরো বলেন, ‘১০ মাস লেবুর দাম পাইনি। বাজার নিয়ে এলেও কেউ জিজ্ঞাসও করে না। এই মাসটাই আমাদের একটু লাভ হয়। কেউ সেটা বুঝবে না। কিছুদিন আগেও আমি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সবাইকে বলেছি ফ্রি লেবু দেব। তখন চাহিদা ছিল না। বাগানেই লেবু পচে থাকত। এখন ৩-৪টা গাছ খুঁজে ১টা লেবু পাওয়া যায়। গাছ থেকে লেবু সংগ্রহ করে বাজারে নিয়ে আসতে খরচ হয়। পাইকারি বিক্রি করে যে টাকা তাতে খরচ উঠে আসে না। হয়তো কিছুদিন পর লেবু চাষ করা ছেড়ে দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমি লেবুর পাশাপাশি নাগা মরিচের চাষ করি। যা লেবু গাছের সাথী ফসল। সেগুলো আবার লটারির মতো। লাগলে লাগছে না লাগলে নাই।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (কৃষিবিদ) মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলে এ বছর ৮০০ ও কমলগঞ্জে চাষ হয়েছে ১৪০ হেক্টর জমিতে লেবু চাষ হয়েছে। এত লেবু চাষ হওয়ার পর কেন এত দাম কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারা বছর লেবুর চাষ হয়। কিন্তু কৃষকরা তো সারা বছর লাভ করতে পারে না। প্রায় ১০ মাস তারা খরচটা বের করে আনা দায় হয়ে পড়ে। এই দুই মাস লেবুর একটু চাহিদা। তাই এই সময়টাতে তারা কিছুটা লাভ করে।
তিনি আরো বলেন, এখানে তো প্রক্রিয়াজাত করে রাখার ব্যবস্থা নেই যদি সেই ব্যবস্থা থাকত তাহলে দাম থাকত না। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে এখানে প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।